Thursday, January 9, 2020

এন আর সি (NRC)এবং সি এ এ(CAA), বিভাজনের রাজনীতিতে ভারত

এন আর সি ( NRC) কি এবং কেন?


ভারতে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) এবং সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট (CAA) কে কেন্দ্র করে পানি অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। ভারত একটি বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র  হিসেবে পরিচিত হলেও দেশটি এখন এন আর সি এবং সি এ এ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের দিকে এগিয়ে গেছে। এন আর সি সমস্যার মূল খুঁজতে আমাদের যেতে হবে পিছনের দিকে। ১৯৭৮ সালে আসামে কংগ্রেসকে পরাজিত করে জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের লক্ষে কংগ্রেস  'বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী' শ্লোগান তোলে। তারা বলতে শুরু করে সীমান্ত দিয়ে লাখ লাখ বাংলাদেশীর অনুপ্রবেশ করে। কংগ্রেসের এই শ্লোগান লুফে নেয় আসামের উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী ছাত্র সংগঠন অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) এবং অল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ। ১৯৭৯ সালে লোকসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবী করে। এ সময়ই গড়ে ওঠে  বাঙালী খেদাও আন্দোলন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এ আন্দোলন চলে। 
 


সত্যিই কি আসামে লক্ষ লক্ষ বিদেশী অনুপ্রবেশ ঘটেছে? 



অল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ (এ জি পি) সরকার ১০ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে অভিযান চালিয়েও অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পায়নি। কিন্তু তারা নতুন বুদ্ধি আবিষ্কার করে, ডি-ভোটার চাতুরী। ১৯৯৭ সালে এ জি পি কোন জরিপ বা খোঁজখবর ছাড়াই হঠাৎ ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ভোটার আছে বলে ঘোষণা দিল। কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই নানা আইনি,অ-আইনি প্রক্রিয়ায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার ভোটার 'ডি ভোটার' হিসেবেই  থেকে গেল। এখনো তারা আসামে ভোট দিতে পারেননা। 


মোদীর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি


এমন সময় মোদী সরকার আসামে এন আর সি ঘোষণা করল যখন আসামে- অসমিয়া, বাঙালী অসন্তোষ  প্রায় নেই বললেই চলে।  ১৯৮৫ সালে যে 'আসাম চুক্তি' হয়েছিল তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল 'নাগরিক পঞ্জি' তৈরি করা। গত ৩৪ বছর এ সমস্যার যৌক্তিক সমাধান না করে বিজেপি সরকার আরোও কট্টর অবস্থান নিল। ভোটার সংখ্যার হিসাব-নিকাশে আবার আসামে জনগনের মধ্যে একটি বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করল। বিজেপি সভাপতি অমিত সাহা ১৭ই ফেব্রুয়ারি জনসম্মুখে ঘোষণা করেছিল যে,"আসাম থেকে বাঙালী-মুসলমান খেদানো হবে।"
  
গুয়াহাটি প্রাগ নিউজ এর প্রধান সম্পাদক এবং অসমীয় ভাষার প্রধান সাংবাদিক অজিত ভুইঞা  বলেন, "বাঙালী-অসমীয়া ধেরিজ এখন প্রায় নেই।"
আসামে বিজেপি জনসমর্থন বাড়াতেই মূলত অনুপ্রবেশ সমস্যাকে আবার জীবিত করেছে।এতে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, নিরাপত্তা ইত্যাদি সমস্যাকে আড়াল করা হয় এবং বাঙালী মুসলমান বিরোধী ক্ষোভও প্রয়োগ করা  যায়। কিছু মানুষ তাদের এই অপপ্রচারে বিশ্বাস করে ঠকেছেনও।
জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (যদিও এটি মোটেও জাতীয় নয়, আসামকে কেন্দ্র করেই তা করা হচ্ছে।) আসামে কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে - আইনি ভাষায় বলা যায় " Innocent until proven Guilty" অর্থাৎ একজন মানুষকে নিরপরাধ হবে যতোক্ষণ না সে অপরাধী প্রমাণিত হয়। 
কিন্তু এন আর সি এর মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্র তার নাগরিককে বলছে,"you are Guilty until proven innocent" অর্থাৎ আপনি অপরাধী যতোক্ষণ না আপনি প্রমাণ করতে পারছেন আপনি নিরপরাধী"। জনগনকে প্রমাণ করতে হবে যে,তিনি ঐ দেশের নাগরিক যদি তিনি প্রমাণ না করতে পারেন তাহনে তিনি ঐ দেশের নাগরিক নন। যে সকল শর্তগুলো যুক্ত করা হয়েছে সে শর্তগুলো অধিকাংশ মানুষ পূরণ করতে সক্ষম নন। বাপ-দাদার জন্ম সন্দ,আধার কার্ড, জমির দলিল, ভোটার আইডি কার্ড ইত্যাদি। কাগজপত্র কোথায় পাবে? দেখা গেছে যাদের কিছু কাগজপত্রও আছে  সেগুলোতেও নামের বানান ভুল,ছবি একজনের নাম আরেকজনের সমস্যা, ফলে বিশেষত গরীবমানুষ কোন ভাবেই প্রমাণ করতে পারবেননা তারা ভারত দেশের নাগরিক দুই তিন পুরুষ ধরে ঐ অঞ্চলে বসবাস করলেও কিংবা নাড়ী পোতা থাকলেও।


এ বছর 'আওয়াজ' নামে একটি প্রভাবশালী অনলাইন এক্টিভিজম অয়েবসাইট ভারতে গবেষণা করে দেখিয়েছে - আসামে নাগরিক পঞ্জি হালনাগাদ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশী-মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামাজীক যোগাযোফগ মাধ্যমে ব্যাপকহারে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল। তারা আরোও জানায় মিয়ানমারে রোহিংগাদের গনহত্যার আগে যে ধরনের ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল  আসামে এন আর সি চলাকালীন হেটস্পীচ গুলোর সঙ্গে তার মিল রয়েছে। এসব হেটস্পীচ সর্বমোট ৫৪ লক্ষবার দেখা হয়েছে এবং ১ লক্ষবার শেয়ার করা হয়েছে। ফেসবুক এবং হোয়াটস এপে হেটস্পীচ দেওয়ার তালিকায় আছেন প্রাক্তন আলফা নেতা এবং বিজেপি'র আইন প্রণেতাও।

নরেন্দ্র মোদী এক বক্তৃতায় বলে বসলেন,"আন্দোলনকারিদের তাদের পোশাক দেখে চিনতে হবে"
অনুপ্রবেশের কারণে অসমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে এবং তাদের সংস্কৃতি বিপন্ন হবে বলে যে প্রচার চলছে তাও ভিত্তিহীন। অসমীয় ভাষার জনগন গত ৫০ বছরের হিসেবে এখন বেড়ে প্রায় ৬০ ভাগের উপর। আর সাধারন মানুষের মেলামেশা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয় বই অনুন্নত হয় না। এসব প্রচারণা  মানুষকে ভাষা-ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে শাসন পাকাপোক্ত করার চেষ্টা মাত্র। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সরকার এককাঠি সরেষ।

২ লক্ষ ৫০ হাজার ডি-ভোটার শ যে ১৯ লক্ষ মানুষ নাগরিক নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ পড়েছেন তাদের কি হবে?


এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের সীমান্তে আসামে ৪৬ কোটি রুপি ব্যয়ে  ডিটেনশন ক্যাম্প  তৈরি শুরু করেছে ভারত সরকার যেখানে ৩০০০ লোককে একইসাথে রাখা যাবে।(এরই মধ্য ৯ শতাধিক মানুষকে সেখানে রাখা হয়েছে যাদের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে।) এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯ লক্ষ মানুষের জন্য কতগুলো  ক্যাম্প আর কত টাকা লাগবে?
সচেতন ভারতীয় নাগরিকগণ প্রশ্ন তুলেছেন- জনগনের করের টাকা এভাবে নষ্ট করছে সরকার?  তার উপর যাদের জন্য এই টর্চারসেল তৈরি করা হচ্ছে তারা জানেইনা তাদের দোষ কি অথবা এটা প্রমাণিত নয় তারা ভারতের নাগরিক বা নাগরিক নন! এটা নিশ্চিন্তে বলা যায় যে মোদি সরকার ভেবেছিল এন আর সি এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু বাঙালী-মুসলমানদের কোনঠাসা করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ভারতে বসবাস করতে বাধ্য করবে। কিন্তু দেখা গেল, নাগরিক পঞ্জি হতে বাদপড়া মুসলমানদের সংখ্যা ২ লাখের আসেপাশে, বাকি সবাই বাঙালী হিন্দু! 
এন আর সি'র পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে তারা নতুন নাগরিকত্ব আইন(সি এ এ) নিয়ে এল যার সারকথা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান হতে আগত অমুসলিম তথা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, জৈন, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ আবেদনের ভিত্তিতে ভারতের নাগরিকত্ব পাবে। এই আইনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের বাদ দিয়ে  তাদের (বিজেপি'র) কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী ভারত রাষ্ট্রের নকশা সামনে এল যা তারা বহুদিন থেকেই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে।



অসাম্প্রদায়ীক রাষ্টের দাবী


এন আর সি এবং সি এ এ এর বিরুদ্ধে ভারতের সচেতন ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন তা অভূতপূর্ব। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী হামলা করেছে এবং এ পর্যন্ত ৮ জনের অধিক মতান্তরে ২০ জনের অধিক মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২ শতাধিক আন্দোলনকারীকে। ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন কমপক্ষে ১৭ জন। নাগরিক স্বার্থের পক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় এন আর সি এবং সি এ এ এর প্রত্যাহারের দাবীতে শ্লোগান তুলেছেন। বহু শিক্ষক , বুদ্ধিজীবি , তারকারা রাস্তায় নেমে এসেছেন। 
জাতিসংঘ খোলাখুলি ভাবে এই আইনের বিরোধীতা করে বলেছে,"এই আইন বৈষম্য সৃষ্টি করবে।" 
এরই মধ্যে অন্তত চারটি রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী বলেছেন তাদের রাজ্যে এন আর সি এবং সি এ এ বাস্তবায়ন করবেন না। এ আইনের প্রতিবাদে আসামে খোদ বিজেপি'র একজন সংসদ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন।
হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে হাতে হাত ধরে নাগরিক মর্যাদা রক্ষার আন্দলন করছেন।এ আইনের ফলে শুধু মুসলমান জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তা নয়। 
অমিত সাহা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন সি এ এ কার্যকর করার পর সারা দেশে এন আর সি করা হবে। 
ফলে সারা দেশেই সাধারন মানুষের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে এবং এ আতংক থেকেই নিজেদের বাঁচাবার চ্যালেঞ্জ তারা গ্রহন করেছেন। ভারতের সাধারন মানুষ শাসকদের বিভাজনের রাজনীতি মেনে নেবেন নাকি ঘুরে দাঁড়াবেন তা সময়ই বলে দেবে।


   লেখক:মিজান রহমান
রাজনৈতিক কর্মী 

কারিগরি শিক্ষার ভ্রান্তির ফাঁদে দেশ!

দেশের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যেমন দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন, তেমনি বিদেশেও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করলে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। চলতি বছরের শুরু থেকেই বাড়ছে প্রবাসী আয়। গত মে মাসে দেশের ১৪৮ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ কোটি ৫২ লাখ ডলার বা প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। তবে সব সংস্থাই একমত যে, ৭০ লাখ প্রবাসীর কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশই নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশিরা। এর কারণ হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে স্বল্পদক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধা দক্ষ ও মাত্র ২ শতাংশ পেশাজীবী। এই পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় খুব সহজে বলা যায় তা হলো, এই স্বল্পদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিকদের যদি আমরা দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিদেশে পাঠাতে পারতাম, তবে এই রেমিট্যান্স আরও বেড়ে অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলংকা, চীন কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করেই জনশক্তি রপ্তানি করছে।

একটি কথা বলা হয়, আমরা অর্থনীতিতে ৪৬তম, কিন্তু কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে ১১৪তম। 

এডুকেশন বাংলা

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন মহলে প্রচার প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে অবহেলিত কারিগরি শিক্ষার জয়জয়কার। বিগত কয়েক বছরেই বাড়ানো হয় বিভাগগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা। এই সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।পাঠদানও চলছে দুই শিফটে।  কিন্তু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। একই শিক্ষক পাঠদান করছেন দুই শিফটেই আবার পার্ট টাইম শিক্ষক দিয়েও কোনরকম কাজ চালিয়ে নেওয়া হয়।
নেই কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে গবেষণা কিংবা নুন্যতম উদ্যোগ।   


"২০১৬ সালে দেশে প্রায় আট হাজার কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। দেশের স্কুল-কলেজ -মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা মিলিয়ে যত শিক্ষার্থী আছে তার প্রায় ১৩ শতাংশ টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হয়েছে।"
বিবিসি অনলাইন 

"কারিগরির বর্তমান শিক্ষার্থীর হার নিয়েই শুভংকরের ফাঁকি লক্ষ করা গেছে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান, আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষার সংজ্ঞা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাস্তবে কারিগরিতে শিক্ষার্থীর হার ৮.৪৪ শতাংশ।"

কালেরকন্ঠ

এ ছিল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি  হওয়া শিক্ষার্থীর হিসাব কিন্তু ভর্তি হওয়া সবাই কি শেষ পর্যন্ত এই অদ্ভুত উটের পিঠে বসে থাকতে পারেন?
কেসঃ ০১
২০১৬ সালে ঢাকা পলিটেকনিক ইলেকট্রনিক্স বিভাগের  ২য় শিফটের বি গ্রুপে ১ম পর্বে ভর্তি হয় ষাটজন শিক্ষার্থী ২য় এবং ৩য় পর্বে বেশকিছু শিক্ষার্থী বদলি হয়েও আসেন কিন্তু ২০১৯ সালে ঐ গ্রুপে ৭ম পর্বের শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৫ জনে! আর বাকিরা? ঝরে গেছে প্রায় সবাই আর কেউ কেউ ইয়ার লসের ফাঁদে তারাও হয়তো ফিরবে কিংবা ফিরবে না!

চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম রয়ে গেছে সেই মান্ধাতার আমলে। কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম নিয়মিত আপডেট হয় না। যাঁরা কারিকুলাম নিয়ে কাজ করেন, তাঁরাও দক্ষ নন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর সক্ষমতা তাঁদের নেই।
কালেরকন্ঠ

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ের ব্যাপক চাহিদা। দুই বছর আগে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এই বিষয়টি চালু করলেও এখনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়নি। ফলে যে শিক্ষকের এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকেই পড়াতে হচ্ছে বিষয়টি। বোঝাই যায়, এ বিষয়ে যেসব শিক্ষার্থী পাস করে বের হবেন, তাঁরা কতখানি দক্ষ হবেন।
কালের কন্ঠ

বর্তমানে কারিগরিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো উপযোগিতা নেই। যেমন ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ‘ডিপ্লোমা ইন মাইনিং’। এটি মূলত খনিজ সম্পদ বিষয়ক একটি কোর্স। কিন্তু দেশে খনিজ সম্পদ বিষয়ক সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোও তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এই বিষয়টি চায় না। কারণ অনেক কোর্সেরই একটি বিষয় এটি। ফলে একটি স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা কোর্স হিসেবে এর চাহিদা শূন্য। ফলে এ বিষয়ে ডিপ্লোমা করে চাকরি পাওয়া কষ্টকর। তার পরও কোর্সটি চালিয়ে যাচ্ছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
কালেরকন্ঠ

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো: শাহজাহান মিয়া বলেন, " আমাদের দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষ মানুষ চাকরীর বাজারে আসছে। কিন্তু টেকনিক্যাল খাতে লোকবলের চাহিদা কতটা সেটা আমরা এখনো নির্ণয় করতে পারি নাই।" 
বিবিসি অনলাইন 

দেশে সাধারণ সরকারি-বেসরকারি কলেজের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। অন্যদিকে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা মাত্র ৪৯। আর ৪৬১টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থাকলেও ভালো মানের রয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টি। ফলে বেশির ভাগ বেসরকারি পলিটেকনিকে আসন শূন্য থাকে।
কালেরকন্ঠ

বিশ্বে প্রতিবছর কারিগরি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। বিশেষ করে লেদার, প্লাস্টিক, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস, পোশাক, অটোমোবাইল, এয়ারলাইনস, নার্সিংসহ বেশ কিছু বিষয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের চাকরিদাতারাও কারিগরিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ লোক খুঁজে পাচ্ছে না। এ কারণে অনেক সময় বিদেশ থেকে দক্ষ লোক আনতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক খাতে বর্তমানে অনেক বিদেশি কাজ করছে। অথচ পোশাক খাতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও এখনো প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা যায়নি।
কালের কন্ঠ

নেই উচ্চ শিক্ষার সুযোগ,নেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়, দক্ষ হতে আসা শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন পড়াশোনা নিয়ে ক্লাসও আর করা হয়না নিয়মিত। ব্যবহারিকের গুরুত্ব  শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই বুঝলেও নেই দক্ষ প্রশিক্ষক কিংবা যন্ত্রপা।। যা আছে তাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট। ফলে ব্যবহারিক বা প্র‍্যাকটিক্যাল জব শিট আর সেসনাল খাতায়ই সীমাবদ্ধ।  কখনো কখনো উপস্থিতির  উপরই নাম্বার দিয়ে দেওয়া হয়। পাঠ্যপুস্তকের অবস্থাও শোচনীয় মানহীন কতগুলো গাইড প্রকাশনীর কাছেই যেন কারিগরি শিক্ষা জিম্মি হয়ে আছে। সমাধান কি?       

সমাধান কল্পে যদিও আমরা একটা প্রস্তাবনা রাখতে পারি বটে কিন্তু সত্যিকার অর্থে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা নিয়ে গবেষণা।   
প্রস্তাবনা (খসড়া)
★পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রমের সংস্কার সাধন এবং বর্তমান  পৃথিবীর উপযোগী করে আধুনিকায়ন।
★পর্যাপ্ত  দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ।
★দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দান কর্মসূচী।
★ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং এর সময়কাল বৃদ্ধি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং নিয়ে ট্রেনিং সেন্টার গুলোর ব্যাবসা বন্ধে উদ্যোগ গ্রহন।    
★কর্মসংস্থানে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজনে বিদেশী চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি।
★উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি।
★বিভাগ অনুযায়ী কর্মসংস্থানের  নিশ্চয়তা প্রদান।
★ব্যবহারিক ক্লাস,যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষনের আধুনিকায়ন।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে তা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কারিগরি শিক্ষা ও এর মাধ্যমে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বিভিন্ন পেশায় বর্তমানে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই লাখ বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৪০ হাজার কোটি টাকা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ আমাদের শিল্পোদ্যোক্তাদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ দেশীয় জনগোষ্ঠীর ওপর আস্থাহীনতা। এই আস্থাহীনতা কীভাবে দূর করা যায়, বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপ, আফ্রিকাসহ যে দেশগুলোয় দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যেতে পারে, তা খুঁজে বের করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন (ডওঘ) ও গ্যালাপ (এঅখখটচ) ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে আশাবাদের দেশ বাংলাদেশ। আশাবাদ গ্যালাপের সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ আশাবাদী দেশের তালিকায় প্রথম স্থানটি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। আশাবাদী হওয়ার মতো সবকিছুই আমাদের আছে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।


আমাজন থেকে সুন্দরবন

ক'দিন আগেই পৃথিবীর ফুসফুুস খ্যাত আমাজন স্বীকার হল অদ্ভুতুড়ে এক দাবানলের। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি দেখা যায় বনের ঠিক মাঝে বৃত্তাকার বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আগুন। এ ব্যাপারে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। (বিবিসি, সিএনএন)


★আমাজন অরণ্যের গুরুত্ব অনেক। পৃথিবীর ২০% অক্সিজেন আসে আমাজন থেকে। আমাজন পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্যের একটি। এই বনের নদী বা আমাজন নদী বেশির ভাগ নদীর উৎস। এই নদী বিশ্বে প্রচুর পানির যোগান দিয়ে থাকে। এছাড়া ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড় আছে। এছাড়া ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরিসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তনপায়ী প্রাণী আছে। এছাড়া আমাজন নদীতে ৩০০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী আছে।
প্রানিকুলের সনাক্তকৃত এক দশমাংশ প্রাণী এই অঞ্চলে বাস করে।
পৃথিবীর সকল পাখির এক পঞ্চমাংশ পাখি এই বনের অধিবাসী।
গড়ে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৭৫,০০০ ধরনের বৃক্ষ পাওয়া যায়।
বিশ্বের মোট ঔষধের ২৫% কাঁচামাল আসে এ বনের মাত্র ৪০০ প্রজাতির গাছ থেকে।
এরপর আসছি নদীর কথায়....
বর্ষা মৌসুমে এ নদীর মোহনা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫,৭৮৭,০৩৭ ঘনফুট পানি আটলান্টিকে নিক্ষিপ্ত হয়।
আমাজন নদী থেকে যে পরিমান পানি প্রতি দিনে আটলান্টিকে প্রবেশ করে তা দিয়ে পুরো নিউইয়র্ক শহরের ৯ বছরের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
পৃথিবীর মোট স্বাদু পানির এক পঞ্চমাংশ স্বাদু পানি আসে আমাজন নদী থেকে।
অতিবৃষ্টি অরণ্যের উদ্ভিদ এবং জীবজন্তুর যে পরিমাণ, আদতে তা যেকোনো বাসস্থানের চেয়ে সমৃদ্ধ। যদিও বিগত কয়েক লক্ষ কোটি বছরের জলবায়ুগত পরিবর্তনে তাদের পরিমাণ কখনও বেড়েছে কখনও কমেছে, তবুও বর্ষাবন হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি বাস্তুসংস্থান। এই ধারাবাহিকতার কারণেই অতিবৃষ্টি অরণ্যে বেড়ে উঠেছে লক্ষ কোটি প্রজাতি, যার অনেকগুলো এনডেমিক (endemic), বা একমাত্র।
তাদের মধ্যে উল্লেখ্য....
১.স্বচ্ছ ব্যাঙ
২.জেসাস গিরগিটি
৩.মাটা মাটা কাছিম
৪.বাদাম মাথার পোকা
৫.মাকড়সা বাঁদর
৬.হানি বেয়ার
৭.ক্যাপিবেরা
৮.সাইক্লোসা মাকড়সা
৯.গ্রেট পোটো
১০.গোলাপি ডলফিন
যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিজ্ঞানী আশংকা প্রকাশ করেছেন যে আমাজন অরণ্য আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ব্যাপক অপরিকল্পিত বন নিধন ই হবে এর কারণ। পেনিসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেম্‌স্‌ এল্‌কক বিবিসি কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য প্রদান করেন। তার মতে জটিল প্রতিক্রিয়া নামক পরিবেশ সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় এমনটা ঘটতে পারে।

এবার আসি সুন্দরবন এর কথায়...

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভের মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম হচ্ছে সুন্দরবন।
শুধুমাত্র পাখ পাখিই নয়, রয়েছে অনেক বন্যপ্রাণী।রয়েছে অসংখ্য বিষধর সাপ। শুধু তাই নয়, বিশাল আয়তনের অধিকারী সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতিক সম্পদ। সুন্দরবনের মাঝে রয়েছে ছোট বড় প্রায় পাঁচ হাজার নদী।
গবেষকরা বলেছেন,
‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। অথচ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ উপেক্ষা করে নৌ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে স্থায়ী নৌরুট চালু করেছে।’
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌরুট চালু থাকায় মালামাল পরিবহনে সক্ষম নয়, এমন পরিবহন চলাচল করছে। অপরিপক্ব নৌযান দ্বারা ফার্নেস ওয়েল পরিবহনের সাথে দুর্ঘটনা ঘটেছে। যেই পরিবহনে সাড়ে তিন লাখ টন ফার্নেস ওয়েল তেল ছিল। দুর্ঘটনার পর সেই তেল সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে প্রায় ১৪০ কি.মি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
সুন্দরবন এলাকার রামমঙ্গল নদীপথ দিয়ে পড়শি রাষ্ট্র ভারতের জাহাজগুলো প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বজবুজা নদী হয়ে অঙ্গতিহারা চেকপোস্ট দিয়ে এসব জাহাজ মংলাবন্দরের দিকে যাচ্ছে। জানা যায়, বজবুজা নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ভারতের ১৫টি জাহাজ চলাচল করে। নৌপথে যানবাহন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণ হচ্ছে। শব্দ দূষণ প্রতিটি প্রাণীর জন্য মারাত্মক ব্যাধি। শ্যালা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী সব উন্নয়ন প্রকল্প স্থানান্তর করতে হবে। সুন্দরবনের মাঝে নৌরুট বন্ধ ঘোষণা করতে হবে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ বিরাট হুমকির মুখে। এসব নৌপথ দিয়ে অব্যাহত বর্জ্য নিক্ষেপ ও বিকট সাইরেনের কারণে নানারকম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে দেখা যায়, গত ৩৭ বছরে ১৪৪ কিলোমিটার আয়তন হারিয়ে গেছে।অথচ দেশের বনাঞ্চলের ৫১ ভাগই হলো সুন্দরবনে।
পৃথিবীর যেকোন বন, সুন্দরবন কিংবা আমাজন তা কোন রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকতে পারেনা,এগুলো পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের, যাবতীয় প্রানীর সম্পত্তি। এগুলোর ওপর অধিকার যেমন পৃথিবীর সবার তেমন এগুলো রক্ষা করার দায়িত্বও পৃথিবীর সকল মানুষের।
তথ্যসূত্রঃ
বিবিসি,সিএনএন,প্রথম আলো,মানবজমিন, বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং অনলাইন।

অতিথি পাখিরা কি অতিথির মর্যাদা পায়?

প্রাণী জগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাখিরা। কবি বাল্মীকি এক বিরহাতুর পাখিকে দেখেই শ্লোকগুলি লিখেছিলেন। এটিই নাকি আদি কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বার বার এসেছে পাখির কথা। পার্সি বিসি শেলির ‘টু এ স্কাইলার্ক’ বা জন কিটসের ‘ওড টু নাইটিঙ্গেল’-এর বিষয়ই পাখি।কিন্তু কাব্যের জগত আর বাস্তব এক নয়। কাব্যে আদরণীয় অনেক পাখিই আজ বিপন্ন। পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক প্রজাতির পাখি। বিশাল পাখির সাম্রাজ্যে এমন বেশ কয়েকটি শ্রেণির পাখি আছে, যারা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অন্য জায়গায় পাড়ি দেয়। বাংলাদেশে শীতকালে এমন কিছু পাখি দেখা যায় যা সচরাচর অন্য সময়ে দেখা যায় না।শীত মৌসুমে (এখানে মৌসুম বলতে দুমাসের একটি ঋতু না বুঝিয়ে ঐ ঋতুর প্রায় দুমাস আগে ও পরের সময়কে বুঝানো হয়েছে।)  হিমালয় পর্বতমালা এবং সুদূর সাইবেরিয়া থেকে,কদাচ উত্তর মেরু থেকেও কিছু পাখি আমাদের দেশে প্রতি বছর আসে এবং আবার ফিরে যায়।এই সংবার্ষিক আসা যাওয়াই হচ্ছে পাখির পরিব্রাজন,অভিপ্রায়ন বা মাইগ্রেশন।অভিপ্রায়ত পাখিকে আমরা বলি শীতের পাখি,অতিথি পাখি বা যাযাবর। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শীতের পাখি আসে ভরা শীত মানে পৌষ ও মাঘে।উপরন্ত সব শীতের পাখি আসে সাইবেরিয়া থেকে।এই দুইটি ধারনা বহুলাংশে মিথ্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক(অবসর প্রাপ্ত) ডাঃ মোঃ আলী রেজা খান এর জরিপ মতে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা আসতে থাকে বাংলাদেশে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এই তিন মাসে দেশের সর্বত্র শীতের পাখি সর্বাধিক দেখা যায়। দেশে যত পাখি আসে তার ৮০ ভাগের উপর পাখি আসে হিমালয় পর্বত ও তার পাদদেশ থেকে।কেবল কিছু কিছু হাঁস এবং জিরিয়া আসে সাইবেরিয়া এবং উত্তর মেরু থেকে।ভারতের Bombay  Natural History Society র গবেষণা থেকে এই তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন, উপকূল, সিলেট অঞ্চলের হাকালুকি হাওর, টাংগুয়ার হাওড়, বাইক্কা বিল, ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভোলা সহ বিভিন্ন উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা আর চরগুলো অতিথি পাখির কোলাহলে মুখরিত থাকে।  

অতিথি পাখি কেন আসে কেন যায়ঃ 

শীতের শুরুতে হিমালয়ের তিন হাজার মিটার উচ্চতা থেকে এভারেস্ট পর্বতের চূড়া, সাইবেরিয়া এবং উত্তর মেরু এলাকায় দিনের তাপমাত্রা হ্রাস পায়,শীতের প্রচণ্ডতা বাড়ে,হ্রাস পায় দিনের আলোর পরিমান।সেই সাথে সকল খাদ্যবস্তু বরফের পুরো আবরণে ঢাকা পড়ে।ফলে পাখিরা উত্তর মেরু ও সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিনে,হিমালয়ের উঁচু এলাকা থেকে নিচু এলাকা,পাদদেশ বা দক্ষিনের সমভুমি এলাকায় নেমে আসে ঐ সব প্রতিকুল অবস্থা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। উত্তরের পাহাড়ের চূড়ায় যখন প্রতিকুল আবহাওয়া ও পরিবেশ তখন দক্ষিনের প্রকৃতি মোটেও রুদ্র নয়।সেখানে তখনো ১১ ঘন্টায় দিন।সবে বর্ষার পানি সরে গিয়ে কাদায় গজাচ্ছে নতুন উদ্ভিদ,পোকা মাকড় ও কীট পতঙ্গ।এসব খাবার ও বন্ধুসুলভ পরিবেশ ব্যবহারের জন্য চলে সাংবার্ষিক আসা যাওয়া,যা আজও চলছে। আমাদের দেশে দু'দলের শীতের পাখি আসে।এদের এক দল কেবল এদেশেই আসে এবং এখান থেকেই ফিরে যায়।অন্য দল বাংলাদেশ থেকে আরো দক্ষিনে যায়।এদেশ থেকে ফিরে যাবার জন্য শীতের পাখিদের দেহে কিছু বাহ্যিক এবং কিছু অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক কাজ করে।প্রথম উদ্দীপক হচ্ছে চামড়ার নিচে খুব পুরু হয়ে জমে উঠা চর্বি।দ্বিতীয় হচ্ছে আবহাওয়াগত যেমন দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, দৈনিক গড় তাপমাত্রা এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমান। পাখি বিশারদ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, 'দেশি-বিদেশি নয়, যে পাখি একদিন এদেশে দেখা যায়, সেটাও এদেশের পাখি৷ কিছু পাখি এ দেশে সারা বছর থাকে, কিছু থাকে না৷ পাখি এরকমই হয়৷ পাখির খাবার সারা বছর এক মহাদেশেও হয় না৷ কিছু পাখি আছে গ্রীষ্মে বা শীতে খাবারের জন্য একেক জায়গায় থাকে৷ আবার প্রজননের জন্য আলাদা জায়গায় থাকে৷ তাহলে কোন পাখি কোন দেশের? সারা বিশ্ব যেটি মেনে নেয়, সেটি হলো, পাখিরা একদিনের জন্য যে দেশকে নিয়মিত ব্যবহার করে, পাখিরা সেই দেশের৷ এক পাখি বহু দেশের হতে পারে৷ যেমন ধরেন, সুমচাও নামের পাখি গ্রীষ্মে বাংলাদেশে জন্মায়, শীতে তাদের কিন্তু খাবার নেই, তাই তারা দক্ষিণে, যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় চলে যায়৷ আবার তারা গ্রীষ্মে এই দেশে ফিরে আসে৷ এই পাখি তাহলে কোন দেশের? এটা বাংলাদেশেরও, মালয়েশিয়ারও৷ আবার অনেক পাখি আছে যারা শীতে বাংলাদেশে আসে৷ এরপর প্রজননের জন্য হিমালয়ে চলে যায়, তিব্বতে চলে যায় বা তুন্দ্রা অঞ্চলে চলে যায়৷ তারা কি তাহলে বাংলাদেশের পাখি নয়? অবশ্যই বাংলাদেশের পাখি৷ ওরা সাইবেরিয়ারও পাখি৷ এই হিসেবে আমাদের যে ৭০০ প্রজাতির পাখি আছে, এর মধ্যে সাড়ে ৩শ' প্রজাতির পাখি সারা বছর বাংলাদেশে থাকে না৷' 

বিশ্ব অতিথি পাখি দিবসঃ 

এই পাখিদের আবাস নিরাপদ রাখতে ও বিচরণ স্বাভাবিক রাখতে প্রত্যেক বছরের ১১ মে দিনটি "বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস" হিসেবে পালন করা হয়। ১১ মে-র কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা থেকে পাখিরা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দিকে উড়ে যায়। তাই এই দিনটিকে ‘বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। পরিযায়ী পাখি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এই উদ্যোগ। ২০০৬ থেকে দিনটি পালন করা হচ্ছে। 



বাংলাদেশে কত অতিথি পাখি আসেঃ 



প্রায় ৩শ' প্রজাতির পাখি শীতে বাংলাদেশে থাকে, কিন্তু প্রজনন করে না৷ প্রজননের সময় হলো উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্ম৷ তখন তারা উত্তরে চলে যায়৷ হিমালয়, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া বা আরো উত্তরে সাইবেরিয়ায় চলে যায়৷ আর ১০ থেকে ১২ প্রজাতির পাখি আছে, যারা গ্রীষ্মেই শুধু বাংলাদেশে থাকে, শীতে এখানে থাকে না, দক্ষিনে চলে যায়, যেখানে শীতেও কিছুটা আর্দ্র৷ আট থেকে নয় বছর আগেও বাংলাদেশে চার থেকে পাঁচ লক্ষ অতিথি পাখি আসতো। কিন্তু সেই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। তবে বাংলাদেশে অতিথি হয়ে আসা ৩০০ প্রজাতির মধ্যে মাত্র ৮০ প্রজাতি জলাভূমি দাপিয়ে বেড়ায়। বাকি ২২০ প্রজাতির বিচরণ বনাঞ্চলে। তাই অতিথি পাখি মাত্রই হাওর কিংবা জলাশয়ে থাকবে এমন ধারণাটিও সঠিক নয়। এসব পাখিদের মধ্যে বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির বালি হাঁস, খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, পাতিকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কণ্ঠ বৈচিত্র্যের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রাজহাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙামুড়ি, কালোহাঁস, রাজহাঁস, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি। 

কীভাবে অতিথি পাখি গোনা হয়ঃ 

আকাশে ডানা ঝাপটে বেড়ানো এই জীবদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত না করে তাদের সংখ্যা নিরূপণ করা বেশ কঠিন কাজ। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা এই কঠিন কাজটিকে বেশ ভালোবাসেন। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে এই কয়েক মাস তারা ঘুরে বেড়ান জলাশয় থেকে জলাশয়ে। পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব যাতে না পড়ে এমন দূরত্ব থেকেই তাদের কাজ করতে হয়। পাখিদের মাথা গোনা থেকে শুরু করে ছবি তোলা, বৈজ্ঞানিক নাম সংগ্রহ করার পাশাপাশি প্রতিটি প্রজাতির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য নোট করে নেন দলের সদস্যরা। আর এভাবেই কয়েকটি জরিপের তথ্যকে গড় করে পাখির অনুকূল সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। এ তো গেলো জলার পাখিদের গোনার গল্প, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো পাখিদের সংখ্যা নিরূপণ করাও বেশ কঠিন। পাখিদেরকে কয়েক বছর ধরে লক্ষ করতে হয়। শব্দ শুনে, ডানার আকৃতি দেখে আলাদা করতে হয়। পাখিদের পায়ে রিং পরানো হয়, প্রযুক্তির কল্যাণে অতিথি পাখিদের সাথে জুড়ে দেওয়া যায় স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার, গতিপথ নিরূপণের পাশাপাশি তাদের খাদ্যাভ্যাস আর প্রজননের হাল-হকিকতের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও জানা যায় এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

★ অতিথি পাখি কমার কারনঃ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মূলত পাখি পরিযানের জন্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। আরডিআরএস (RDRS)বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ সমন্বয়ক মামুনুর রশিদ বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে। তিনি বলেন, হিমালয়, সাইবেরিয়ান, নেপাল, জিনজিয়াং এবং মঙ্গোলিয়া অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা অব্যাহত বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু প্রজাতির পাখির জন্য শীত মৌসুমেও ঐসব এলাকা বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। পাখি বিশেষজ্ঞ আব্দুস সালাম বলেন, জলাভূমি হ্রাস পাওয়ায় এবং জলাশয় থেকে অনেক প্রজাতির মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হওয়ায় অতিথি পাখি আগমনের সংখ্যা কমছে। পথে পথে লম্বা সব মোবাইল আর ইলেকট্রিক টাওয়ার, পাখিদের পরিযানের চিহ্নগুলো ধ্বংস হয়ে যাবার ফলে পাখিদের পরিযানে সৃষ্টি হচ্ছে বাধা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলাশয়গুলো ভরাট হচ্ছে, গড়ে উঠছে মানুষের বাসস্থান আর কৃষিজমি। ইনাম আল হক বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের দেশেরই সমস্যা নয়, সারা পৃথিবীর সমস্যা। সম্প্রতি ‘বিজ্ঞান’ নামক একটি জর্নালের মে সংখ্যার প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৫ বছরে পৃথিবী থেকে ৮০ শতাংশ পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ শেষ হয়ে গেছে। তো ৮০ শতাংশ পোকা শেষ হয়ে গেলে পাখি কী খেয়ে বেঁচে থাকবে? মানুষ এবং পরিবেশের জন্য কীটনাশক অত্যন্ত বিষাক্ত। পতিত জমিকে প্রাকৃতিক অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখা। কিছু ঘাস, কিছু লতাগুল্ম যে স্থানে রয়েছে সেখানেও তো পাখি থাকে। সেই পতিত জমিটুকুও তো নেই।’ 

বন্ধ্যাত্বের শিকার হচ্ছে পাখিরা? 
পৃথিবীতে মানুষ বাড়ার সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অল্প জমিতে বেশি ফলনের আশায় মানুষ ব্যবহার করছে রাসায়নিক সার আর কীটনাশক। কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক একদিকে যেমন পাখিদের খাদ্যসংকট তৈরি করছে, অন্যদিকে এসব ক্ষতিকারক দ্রব্য খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে। ফলে পৃথিবী জুড়ে বিপুল সংখ্যক পাখির প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। আর এ পাখিরা শিকার হচ্ছে বন্ধ্যাত্বের। পরিযায়ী পাখিরা এই রাসায়নিক বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকির সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে। পাশাপাশি মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের ফলেও পাখিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রজননক্ষমতা হারাচ্ছে বলে গবেষকদের কাছে তথ্য রয়েছে। 

"বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের প্রভাব আর সব প্রাণীর মতো পাখির জীবন যাত্রায়ও প্রভাব ফেলছে"   

বাড়ছে অবৈধভাবে পাখি শিকার!
আইনের তোয়াক্কা না করেই অনেকেই অতিথি পাখি শিকার করে চলেছে। সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে পুলিশের নজরদারি থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আসা অতিথি পাখিদের পড়তে হয় শিকারীদের কবলে। বিশেষ করে ভোলা সহ মাঝির চর, নেয়ামতপুর চর, চর ফ্যাশন, চর কুকড়ি-মুকড়িতে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শিকারীরা ধান ক্ষেতগুলোতে নানা ধরনের রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করেই পাখিদের কাবু করে। পাশাপাশি আছে জালের মাধ্যমে পাতা ফাঁদ, যেগুলোতে খুব সহজেই পাখি ধরা পড়ে। শিকারকৃত পাখির একটি বড় অংশ বিক্রি হচ্ছে বাজারে। পাখিটিকে বিষ দিয়ে মারা হয়েছে কিনা এ কথা চিন্তা না করেই ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিভিন্ন চর এলাকার বাজারে অতিথি পাখি কিনে নিচ্ছেন স্থানীয়রা। ডাক্তার আর বিষেশজ্ঞদের মতে, পাখি ধরার জন্যে যে বিষ ব্যবহৃত হচ্ছে তা মানবদেহেও বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। 

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় পাওয়া তথ্যে বিশিষ্ট প্রাণিবিজ্ঞানী তপন কুমার দে বলেন, “প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে ৩০০ মিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক সামগ্রী মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর আট মিলিয়ন (৮০ লাখ) টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-নালা হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়। “সমুদ্র সৈকতে আসা পাখির খাদ্য গ্রহণের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকের ছোট ছোট অংশ খাদ্যনালীতে চলে যায়। শুধু তাই নয়, পাখির ছোট বাচ্চাদের পেটে প্লাস্টিক কণা পেটে চলে যায় ও অকালে মারা যায়।” 

জা:বি: এর অতিথি পাখির সংখ্যা কমার কারনঃ 
অতিথি পাখির মেলাখ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের জলাশয় পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে থাকে শীতের শুরু থেকেই। গাছপালায় ঢাকা সবুজ এ ক্যাম্পাসের বুকে আছে বেশ কয়েকটি জলাশয়। বেশ কয়েক বছর ধরে এ জলাশয়গুলোকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে শীতের অতিথি পাখিরা। তাই অতিথি পাখি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেন একে অপরের পরিপূরক। প্রতিবছর ক্যাম্পাসের লেকগুলোতে আসে অসংখ্য অতিথি পাখি। তবে দিন দিন পাখির আগমনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গবেষকেরা মনে করছেন, পাখিদের বিরক্ত করায় অতিষ্ঠ হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ছে পাখিরা। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাখিদের বিরক্ত না করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো হয়েছে। কিন্তু সেগুলো মানছে না কেউ। লেকের পাশের রাস্তা দিয়ে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য উচ্চশব্দে মাইকিং, শোভাযাত্রার বাদ্য-বাজনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বহিরাগতদের গাড়ি, মোটরসাইকেলের হর্নের বিকট শব্দ। এমনকি লেকের পাড়ে গাড়ি রেখে উচ্চশব্দে গান শুনতেও দেখা যায় দর্শনার্থীদের। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্টসংলগ্ন লেকটি পাখিশূন্য হয়ে পড়ছে।  

পরিযায়ী পাখি রক্ষায় সচেতনতাঃ 

রাবি ক্যাম্পাসে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য করার ফলে উপযুক্ত একটি আবাসন তৈরি হয়েছে। এখানে পাখিদের কেউ বিরক্ত করে না। পাখিরা সময় হলেই চলে আসে ক্যাম্পাসে। বিশেষ করে তারা পাখি কলোনিতে বসবাস করতে খুবই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। এছাড়াও এখানে তাদের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও প্রজনন ব্যবস্থা। কিছু পাখি গাছে প্রজনন করে, কিছু পানিতে। পরিয়ায়ী পাখিরা ক্যম্পাসে আসতে শুরু করে অক্টোবরের দিকে তারা মার্চ পর্যন্ত থাকে। কালো মানিক জোড়, ধলা মানিক জোড়, সরালি পাখি বেশির ভাগ আসে। পাখিদের বসবাসের সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানাভাবে সহায়তা করেছে। এ বছর প্রথমবারের মত জল ময়ুর এর প্রজনন ঘটতে দেখা গেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। 

★পরিযায়ী পাখি বাঁচাতে প্লাস্টিক ব্যবহার ও দূষণ বন্ধ করে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
★অতিথি পাখির বাসস্থান ও প্রজননের অনুকূল পরিবেশ রক্ষা করা। 
★আইনের ফোঁকর দিয়ে কিংবা কোস্ট গার্ডের চোখে ধুলো দিয়ে যারা অতিথি পাখি শিকার করছে, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। 
★পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ এলাকায় হাঁস-মুরগির খামার না করা।


সুমনা ইসলাম
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্রঃ
সমকাল,বিডিনিউজ২৪,প্রথমআলো,ভোরের কাগজ,মানবজমিন,কালের কন্ঠ,আনন্দবাজার পত্রিকা, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী,অনলাইন নিউজ

মওলানা ভাসানী - ইতিহাস যাকে মনে রাখবে

৮৮০ খ্রীস্টাব্দ : ১২ ডিসেম্বর জন্ম। সিরাজগঞ্জ শহরের অদুরে সয়া ধানগড়া গ্রামে। পিতা আলহাজ শরাফত আলী খান। মাতা মজিরন বিবি। শৈশব- কৈশোরের সন্ধিক্ষনে পিতৃহারা হন। তখনই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সূফী সৈয়দ নাসির উদ্দিন আহমদ বোগদাদীর (রঃ আঃ ) দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যৌবনের উন্মেষে চিরদিনের জন্য গৃহত্যাগী হন। সূফীর সহচর্যে ময়মনসিংহ শহরের উপকন্ঠে বাদে কলপা গ্রামে তিন বৎসর কাটিয়ে তাঁরই সাথে আসামের ধুবরী মহকুমার জলেশ্বর গ্রামে বসবাস করেন। সৈয়দ নাসির উদ্দিন আহমদ বোগদাদীর (রহঃ) তত্ত্বাবধানে কালক্রমে তাসাউফের সাধনা সমাপ্ত করেন। একই সাথে চলে কিতাবী শিক্ষা গ্রহন।
 মওলানা ভাসানীর মানসগঠনে সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছেন তি সুফি বুজুর্গ যার নাম সৈয়দ নাসির উদ্দিন আহমদ। তিনি বাগদাদ হতে এসেছিলেন। মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭-৫৮) পরবর্তীতে কোলকাতায় বসবাস করছিলেন হেকিমি চিকিৎসক হিসেবে। মওলানা ভাসানীর পিতা আলহাজ শরাফত আলী খানের সিরাজগঞ্জ শহরে ছোট্ট একটি জুতার দোকান ছিল যার মালামাল ক্রয় করতে তাঁকে কোলকাতায় যেতে হত এবং ঐ সুবাদে সৈয়দ বুজুর্গের সাথে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব জমে ওঠে। বন্ধুর বাড়ী সিরাজগঞ্জে তিনি এসেছিলেন এক সুদখোর মহাজনের পরিত্যক্ত বাড়িতে ইন্দিরা ও দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করতে। তখন দেখেন শিশু আবদুল হামিদ খানকে এবং কিশোর বয়সের সর্বহারা ঐ ইয়াতিমকে আপন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। ইতোমধ্যে সৈয়দ বুজুর্গ আসামে বসবাস করতে শুরু করেন। গ্রামের নাম জলেশ্বর। থানা ও জেলা ধুবরী। তরুণ বয়স হতে মোঃ আবদুল হামিদ খান সৈয়দ নাসির উদ্দীন আহমদের চোখে চোখে লালিতপালিত হয়েছেন। তিনি তাঁকে জীবন-বিচ্ছিন্ন লালন-পালন করেননি। আসামের বন-জঙ্গলে কঠোর পরিশ্রমের জীবন, চরম দুঃসাহসিকতার জীবন- সেদিকেই তাঁকে আবদ্ধ করেছেন। জীবনটা ছিল উৎপাদনের জন্য সংগ্রাম-মুখর। জঙ্গল কাটো, হিংস্র পশুর মুখোমুখি হও, বিষধর সাপকেও বশ কর; জঙ্গলের জোঁক, মায় মশার ঝাঁককেও কাবু করে কাজ কর। সাফ-সুতরো হলে লাঙল চালাও, ফসল ফলাও। তরুণ আবদুল হামিদ সংগ্রাম-নির্ভর উৎপাদনমুখীন জীবন গড়ার শিক্ষা পেলেন। 
সুফি বুজুর্গ এতটুকুতেই তাঁকে আটকে রাখেননি। প্রাচীনকালে তপোবনের জীবনে যেভাবে গুরু-কেন্দ্রিক শিক্ষা দেয়া হত, তিনি তাঁকে সেভাবে বিকশিত করে তুলেন। নিজেই তাঁকে আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষা শিক্ষা দিলেন। চিকিৎসাবিদ্যা, তর্কশাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন সুফি বুজুর্গের যা জানা এবং যেভাবে জানা সবই আবদুল হামিদকে রপ্ত করালেন। এভাবে আবদুল হামিদ যখন প্রস্তুত, তখন তাঁকে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে দেওবন্দ পাঠালেন। দেওবন্দে পাঠালেন প্রথানুযায়ী ছাত্র হবার জন্যে নয়, পাঠক্রম অনুযায়ী সনদ অর্জনের জন্যে নয়- পাঠালেন দু’জন ওস্তাদের সাহচর্যে থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় দার্শনিক-তাত্ত্বিক শাহ ওয়ালিউল্লাহর গ্রন্থাবলী পড়তে ও আত্মস্থ করতে। শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান ও সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানি (উভয়ই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ বিরোধী রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা ও ভূমধ্যসাগরের মাল্টা দ্বীপে নির্বাসিত) ১৯১২ পর্যন্ত অনুসন্ধানী আবদুল হামিদ খানকে শাহ ওয়ালিউল্লাহ পড়ালেন। এখানেই পরবর্তীকালের মওলানা ভাসানী শিখলেন- পৃথিবী জুড়ে যুগ যুগ ব্যাপী চলছে জালিম ও মজলুমের লড়াই। মওলানা ভাসানী আহরণ করলেন শাস ওয়ালিউল্লাহর নীতিবাক্য, আরবি ভাষায়- ফুক্কা কুল্লে নেজামিন, বাংলায়- নির্মূল কর বিদ্যমান সব ব্যবস্থা (সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা জালিম প্রতিষ্ঠিত করে)। এই বিপ্লবী নীতিবাক্য মওলানা ভাসানীকে সমগ্র জীবনব্যাপী তাড়া করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। দেওবন্দ পরবর্তী জীবনটা তিনি শুরু করেছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোখলেস, মানিকগঞ্জের আবদুল গফুর তাঁকে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র ধারায় সংযুক্ত করেন। তাঁদের গ্রুপে আরও যাঁরা ছিলেন ভগবৎ চন্দ্র দাস, কৃষ্ণসুন্দর দাস, ওয়াসিমউদ্দিন মিয়া, চুন্নু মিয়া অন্যতম।

‘রব্বানীগণ কখনো সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আল্লাহ্‌ নিজেই বলেছেন: তোমরা রব্বানী হয়ে যাও। আল্লাহ্ আরো বলেছেন: আমার রঙে রঞ্জিত হও। সৃষ্টির লালন-পালনে তিনি কি কখনো সাম্প্রদায়িক? রাব্বুল আলামীন যেমন নন, তেমনি তাঁর পালনবাদের অনুসারিগণও সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।’-মওলানা ভাসানী।

ভাসানীর জীবন যাপনের মধ্যেই আসলে ছিল একধরনের সরলতা,আশ্চর্য  ভাবে মানুষকে টানতেন তিনি। কখনো হয়তো জমিদার মহাজনের বাড়িতে আগুন দিয়ে মহাজনের সুদের কাগজ পুড়িয়ে দিয়েছেন আপামর সাধারণ কৃষক ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে আপন করে নিয়েছে তাকে। বন্যায়-জলোচ্ছাসে ছুটে গিয়েছেন  দূর্গম পীড়িত এলাকায়।ধুবরির চর,আসাম,পাবনা,সিরাজগঞ্জ,টাঙ্গাইল কিংবা অন্য কোথাও যেখানে মানুষ  অত্যাচারিত-নিপিড়ীত  কিংবা কষ্টে থেকেছে ভাসানী ছুটে গেছে,, সৃষ্টির সেবাকেই আমল হিসেবে জ্ঞান করেছেন।  শুধু এই উপমহাদেশের শান্তি নিয়ে ভাসানী চিন্তিত ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক, তিনি ভেবেছেন এই পুরো পৃথিবীর মানুষের শান্তি নিয়ে। এই বার্তা  নিয়ে ছুটেছে,লড়াই করেছেন, বক্তৃতা করেছে  যা কিছু আঁকড়ে ধরার তা ধরেছেন।

 “আজ সারা বিশ্বের মানুষ শান্তি শান্তি বলিয়া চিৎকার করিতেছে। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা হইতেছে না কেন? একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাইবে যে, এখানেও নফসানিয়াত সুকৌশলে কাজ করিয়া যাইতেছে। আমেরিকা চায় আমেরিকার মত করিয়া শান্তি। অপর পক্ষ রাশিয়া চায় রুশদের দৃষ্টিকোণ হইতে। অর্থাৎ ব্যাক্তিগত স্বার্থ দেশগত স্বার্থে রুপান্তরিত হইয়া শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাধার সৃষ্টি করিতেছে। আমরা যদি ভুলিয়া যাইতে পারতাম ব্যাক্তিগত অথবা দেশগত স্বার্থকে, আমরা যদি গ্রহণ করিতে পারতাম পালনবাদের স্বভাব সুন্দর নীতি, তাহা হইলে শান্তি হয়ত সুদূর পরাহত হইত না।” -মওলানা ভাসানী


বঙ্গোপসাগরে মহাসাইক্লোন হয়েছিল ১৯৭০ সনের ১২ নভেম্বর। তখন রমজান মাস ছিল। ১০ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষের লাশ বঙ্গোপসাগরে ভেসে গিয়েছিল। পাকিস্তান সরকার কোন ব্যবস্থাই নেয় নাই তাঁদের জন্য। মওলানা ভাসানী গায়েবিনী জানাজা পড়ান। এলাকাগুলো সফর করে ২২ রমজানের রোজা মুখে, ভাসানী পল্টনের জনসভায় ভাষণ দেন ২৩শে নভেম্বর। সেই সভা শেষে সমাপ্তি টানেন একটি শ্লোগান বলে যা পুরো বক্তৃতার মূল কথা ছিল– “স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান : জিন্দাবাদ”। 
সেই ভাষণের পটভূমিতে কবি শামসুর রহমান ‘সফেদ পাঞ্জাবী’ কবিতাটা লেখেন– 


সফেদ পাঞ্জাবী

শামসুর রহমান

শিল্পী,কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানী,
সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন
দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী
কি বলেন । রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,
যেন মহাপ্লাবনের পর নূহের গভীর মুখ
সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাঁড়ি
উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে । বুক তাঁর বিচূর্ণিত দক্ষিণ বাংলার
শবাকীর্ণ হুহু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের
দৃশ্যাবলীময়, শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা
নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার । জনসমাবেশে
সখেদে দিলেন ছুড়ে সারা খাঁ খাঁ দক্ষিণ বাংলাকে ।
সবাই দেখলো চেনা পল্টন নিমিষে অতিশয়
কর্দমাক্ত হয়ে যায়; ঝুলছে সবার কাঁধে লাশ
আমরা সবাই লাশ, বুঝি-বা অত্যন্ত রাগী কোনো
ভৌতিক কৃষক নিজে সাধের আপনকার ক্ষেত
চকিতে করেছে ধ্বংস, পড়ে আছে নষ্ট শস্যকণা ।
ঝাঁকা মুটে, ভিখারী, শ্রমিক, ছাত্র, সমাজসেবিকা,
শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, ফিরিঅলা, গোয়েন্দা, কেরানী
সমস্ত দোকানপাট, প্রেক্ষাগৃহ, ট্রাফিক পুলিশ
ধাবমান রিক্সা, ট্যাক্সি, অতিকায় ডবল ডেকার
কোমল ভ্যানিটি ব্যাগ আর ঐতিহাসিক কামান
প্যান্ডেল, টেলিভিশন, ল্যাম্পপোস্ট, রেস্তোরা, দপ্তর
যাচ্ছে ভেসে; যাচ্ছে ভেসে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরে
হায়! আজ একি মন্ত্র জপলেন মৌলানা ভাসানী ।
বল্লমের মত ঝলসে ওঠে তাঁর হাত বারবার
অতিদ্রুত স্ফীত হয়; স্ফীত হয় মৌলানার সফেদ পাঞ্জাবী
যেন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবী দিয়ে সব
বিক্ষিপ্ত বেআব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান ।

জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবনপঞ্জির (১৮৮০- ১৯৭৬) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী:

১৮৮০ খ্রীস্টাব্দ : ১২ ডিসেম্বর জন্ম।
১৯০৩ হতে ১৯০৫: সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যোগদান। বিভিন্ন কর্মকান্ডে যোগদান করার পর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন পরিত্যাগ।
১৯০৭ হতে ১৯০৯: সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ বোগদারীর (রহঃ আঃ) নির্দেশে উত্তর ভারতের দেত্তবন্দ দারুল উলুম- এ অবস্থান করেন। সেখানে শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হেসোইন আহমদ মাদানীর প্রত্যক্ষ সাহচার্যে শিক্ষা লাভ করেন। এদের সাহচর্যেই রবুবিয়াতের রাজনৈতিক দর্শন শিক্ষা লাভ হয়।
১৯১১: মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে ও নেতৃত্বে প্রথম প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগদান। (শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর নামে ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।)
কংগ্রেসে যোগদান।
১৯১৭-১৮: প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে তুরস্কের সাহায্যে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার পরিকল্পনা অর্থাৎ ইতিহাস খ্যাত রেশমী রুমাল আন্দোলনে যোগদান এবং এতদউদ্দেশ্যে হেজাজে (বর্তমান সৌদি আরব) গমন ও প্রথম হজ সমাপন। আন্দোলনের নেতাদের মাল্টায় নির্বাসন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
১৯১৯: প্রথম কারাবরণ। দেশবন্দু চিত্তরঞ্জন দাসের সাহচর্য লাভ যা ১৯২৫ সন পর্যন্ত অব্যাহত।
১৯২০ হতে ১৯২৫: দেশবন্ধুর স্বরাজ আন্দেলন ও বেঙ্গল প্যাক্টের সাথে একাত্ব হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগদান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার বীরনগর গ্রামে বিবাহ (স্ত্রী আলেমা খাতুন ভাসানী)
১৯২১ হতে ১৯২৩: খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান এবং কারাবরণ। উত্তর বঙ্গের প্রলয়য়ঙ্করী বন্যায় ত্রাণ কার্যে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও নেতাজী সুভাস বসুর সাথে যোগদান। সকলের দুষ্টি আকর্ষণ।
১৯২৪: কলকাতা কেন্দ্রীক রাজনৈতিক জীবনকে প্রাধান্যে না রেখে বিশেষ করে ১৯১৯ সন হতে আসামের ও পূর্ব বাংলার গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে কৃষক মজুরদের সুসংগঠিত করার ধারাবাহিক কর্মপ্রয়াস বাস্ত বায়নের পর আসামের ভাসান চরে ঐতিহাসিক কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠান। পারিবারিক নাম “মোঃ আবদুল হামিদ খান” এর সাথে “ভাসানী” উপাধি প্রাপ্তির যোগসূত্র এখানেই। তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন বাংলা- আসামের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
১৯২৫ হতে ১৯২৭: আসামে ও পূর্ব বাংলায় কৃষক- মজুরদের স্বার্থে সংগঠন গড়ে তোলায় এবং জমিদার ও সুদখোর মহাজন বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করনে আত্বনিয়োগ।
১৯২৮: কলকাতায় অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে যোগদান।
১৯২৯: আসামের ভাসান চরে দ্বিতীয় বারের কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত। সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দের যোগদান। আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ সম্মেলন পরবর্তীতে- প্রজা-স্বার্থে আইন প্রনয়ণে প্রভাব সৃষ্টি করে।
১৯৩0: রাভী নদীর তীরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদান ও গুরুতর মতবিরোধ।
১৯৩১: প্রলয়ঙ্করী বন্যায় আক্রান্তদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে আসাম হতে টাঙ্গাইলে আগমন। খোশনদপুর তথা সন্তোষের ওয়াকফ সম্পত্তির জবর দখলকারী মহারাজার সাথে বিরোধ ও বিবাদ।
১৯৩২: তদান্তীন ময়মনসিংহ জেলা হতে বহিস্কৃত। ডিসেম্ভর সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলা ময়দানে তিনদিন ব্যাপী কৃষক- প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠান। অতঃপর জন্মভূমি পাবনা জেলা হতে বহিস্কৃত।
১৯৩৩ হতে ১৯৩৫: ১৯৩৩ এ আসামের ভাসান চরে এবং ১৯৩৪ সনে টাঙ্গাইলের চারাবাড়ীতে কৃষক সম্মেলন। আসাম ও পূর্ব বাংলায় সামন্ত প্রথা, সামন্ত শোষন বিরোধী আন্দোলন জোরদার করণ। উত্তর ভারতের আমরুহাতে অনুষ্ঠিত (১৯৩৫) সর্বভারতীয় বিপ্লবী চিন্তাধারার আলেমদের সম্মেলনে যোগদান এবং আলামা আজাদ সোবহানীর সাহচর্য লাভ।
১৯৩৬: আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান। আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতির পদ বরণ। আলামা আজাদ সোবহানীর সাথে মিসরে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন।
১৯৩৭: আসামে কুখ্যাত লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করণ। আসামের মজলুম মানুষের এ জীবনমরণ আন্দোলনে অব্যাহত গতিতে নেতৃত্ব দান। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সদস্য নির্বাচিত যা ১৯৪৭ পর্যন্ত বহাল।
১৯৩৮: আসামের বড়পেটায় এবং মঙ্গলদৈ-এ কৃষক সম্মেলন। পূর্ব বাংলার গাইবান্ধায় কৃষক সম্মেলন।
১৯৩৯: জনগণের পার্টিতে পরিণত করতে মুসলিম লীগের কর্মকান্ড জোরদার করণ।
১৯৪০: মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে প্রাদেশিক সভাপতি (আসাম মুসলিম লীগ) হিসাবে যোগদান। লাহোর প্রস্তাবের সাবজেক্ট কমিটির সদস্য হিসাবে পাকিস্তান প্রস্তাব প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন। দ্বিতীয় বারের মত হজ্ব সমাপন।
১৯৪১: যুগপৎ লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যে পাকিস্তান আন্দোলন পরিচালনা (১৯৪৭ পর্যন্ত)।
১৯৪৪: বড়পেটায় আসাম মুসলিম লীগের সম্মেলন।
১৯৪৫: পূর্ব বাংলায় এবং আসামে ব্যাপক সফর।
১৯৪৬: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী আন্দোলন । মে মাসে আসামের বাস্তুহারা অসহায় মানুষের অধিকার আদায় করতে অনশন। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীতে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৪৭: ৫ মার্চ সমগ্র আসামে আন্দোলনের ডাক। আসাম দিবস পালনের প্রস্তুতিতে সংগ্রামী ঘোষণা। ডুরাং ত্যাগের নির্দেশ অমান্য করায় কারাবরণ। ২০ জুন জোরহাট জেলা হতে মুক্তি লাভ। পূর্ব বাংলায় আগমন। ঐতিহাসিক আসাম- জীবনের অবসন।
১৯৪৮: ১৭ মার্চ পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষার পক্ষ সমর্থন। পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী গ্রæপ সংগঠন। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ।
১৯৪৯: ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। সভাপতির পদ গ্রহণ। অক্টোবরের পূর্ব বাংলার খাদ্যাভাব ও মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে জনসভা এবং বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দান। কারাবরণ। পাকিস্তানের বিশেষতঃ পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে বিরোধী দলীয় আন্দোলনের পত্তন।
১৯৫০-৫১: কারাবাস এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ এর সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যপক কর্মসূচী বাস্তায়ন।
১৯৫২: সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ- এর সভাপতি হিসাবে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান। ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজায় ইমামতি। ২৩ ফেব্রুয়ারি কারাবরণ।
১৯৫৩: এপ্রিল মাসে কারামুক্তি। ডিসেম্বরে যুক্তফ্রন্ট গঠন।
১৯৫৪: ২১ দফা ইশতেহার নিয়ে নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ। বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য ইউরোপ সফর । প্রত্যাবর্তনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ।
১৯৫৫: ২৫ এপ্রিল দেশে প্রত্যাবর্তন। ১৫ জুন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জনসভা। আওয়ামী মুসলিম লীগ দলের আওয়ামী লীগ নামকরণ। নভেম্বরে কাগমারীতে কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৫৬: প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন। ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দান। মিসর আক্রমণ করায় মিত্র শক্তি বিরোধী আন্দোলন। ফুলছুরি ঘাটের সম্মেলনে কৃষক সমিতি প্রতিষ্ঠা।
১৯৫৭: ৬ হতে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন। পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে বিখ্যাত “আসসালামু আলাইকুম” ঘোষণা। মার্চে বিরোধ দেখা দেওয়ায় আওয়ামী লীগ হতে পদত্যাগ। ২৬ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠা। বগুড়ায় কৃষক সম্মেলন। খাদ্য- সংস্কট, স্বায়ত্বশাসন ও পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে অনশন।
১৯৫৮: সামরিক আইনে অক্টোবরে কারাবরণ। ১৯৬২ তে মুক্তিলাভ।
১৯৬৩: মহাচীন সফর। ডিসেম্বরে আইন অমান্য আন্দোলন ষোঘণা।
১৯৬৪: হাভানায় ও টোকিওতে বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদান। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করণ।
১৯৬৫: আইয়ুব- বিরোধী নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে অংশ গ্রহণ। পাক-ভারত যুদ্ধে দেশপ্রেমিকের অনন্য ভূমিকা পালন।
১৯৬৬: ন্যাপের পক্ষ হতে বিখ্যাত ১৪ দফা দাবী উত্থাপন।
১৯৬৭: রংপুর সম্মেলনে ন্যাপের বিভক্তি। তত্ত¡গত প্রশ্নে মহাচীনের সমর্থনে ন্যাপের অবস্থান।
১৯৬৮: ১০ দফা “দাবি সপ্তাহ” পালন। আইয়ুব শাহীর পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ঘেরাও আন্দোলনের ডাক। গভর্নর হাউস ঘেরাও। হরতাল।
১৯৬৯: আইয়ুব আহূত গোলটেবিল বৈঠক বর্জন। সামরিক শাসন ও আইন উপেক্ষা করে শাহপুরে বিখ্যাত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭০: সন্তোষে জানুয়ারিতে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন, পাকিস্তানের টোবাটেক সিং-এ মার্চে কৃষক সম্মেলন, পাঁচবিবির মহিপুরে এপ্রিলে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান। জুন মাসে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন। ৮ সেপ্টেম্বর সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-এর পত্তন ঘোষণা। নভেম্বরে জলোচ্ছ্বাস-বিধ্বস্ত এলাকায় ব্যাপক সফর। ২৩ নভেম্বর পল্টনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার। ৪ ডিসেম্বর পল্টনের জনসভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা। সেদিন তাঁর বিখ্যাত উক্তি : লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালইয়া দ্বীন। সকল প্রকার নির্বাচন বর্জন।
১৭৭১: ৭ জানুয়ারিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা। ৯ জানুয়ারি সন্তোষ দরবার হলে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্তোষ দরবার হলে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা ও কৃষ্টি সম্মেলন অনুষ্ঠান। এক দফা দাবী তথা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টি করতে দেশ ব্যাপী ব্যাপক সফর। ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় স্বাধীনতার দাবীতে আপোষহীন থাকার আহ্বান। ১২ মার্চ ময়মনসিংহে কৃষক সম্মেলন। ৪ এপ্রিল এবং ৬ এপ্রিল পাক-বাহিনীর মোকাবিলা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে প্রাণ রক্ষা। ১৬ এপ্রিল রৌমারীর সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ। স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রামে ভারতে অবস্থান। গৃহবন্দীত্ব বরণ।
১৯৭২: ২২ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্তোষে রাজনৈতিক সমাবেশ। আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ। ৯ এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনসভা। ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত। ডিসেম্বরে নিখিল বাংলা জোয়ান-কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭৩: খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ও অন্যান্য ইস্যুতে ভুখা মিছিল পরিচালনা ও অনশন। আইন অমান্য আন্দোলন। ১২ ডিসেম্বর সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্মেলনে অনুষ্ঠান।
১৯৭৪: দেশব্যাপী ভুখা মিছিলের ডাক। দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে আন্দোলন। সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু। ৭ এপ্রিল সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্মেলন। ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতির প্রতিষ্ঠা ও সম্মেলন অনুষ্ঠান। ১৪ এপ্রিল পল্টনে জনসভা। ২৯ জুন ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে নেতৃত্ব দান। ৩০ জুন হতে সন্তোষে স্বগৃহে অন্তরীণ।
১৯৭৫: সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজে আতœনিয়োগ। ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবকে সমর্থন দান। ৭ ডিসেম্বর সন্তোষে চাষী সম্মেলন অনুষ্ঠান।
১৯৭৬: জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক সফর। ভারতীয় হামলার প্রতিবাদ। ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনায় গুরুতর অসুস্থ। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফারাক্কা মিছিলের ডাক। ১৬ ও ১৭ মে রাজশাহী হতে কানসাট পর্যন্ত ফারাক্কা মিছিলে নেতৃত্বদান। আগস্ট-সেপ্টেম্বর লন্ডনে চিকিৎসার্থে অবস্থান। অক্টোবরে খোদায়ী খিদমতগার প্রতিষ্ঠা। ১৩ নভেম্বরে সন্তোষ দরবার হলে খোদায়ী খিদমতগার সম্মেলনে জীবনের সর্বশেষ ভাষণ দান। ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৯ নম্বর কেবিনে রাত সাড়ে সাতটায় ইন্তেকাল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
১৮ নভেম্বর বাদ আসর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সন্তোষে সমাহিত।


তথ্যসূত্রঃ 
 সৈয়দ ইরফানুল বারীর বিভিন্ন লিখা ও পঞ্জিকা 
উইকিপিডিয়া এবং অনলাইন

সংকলনঃ   
জাফর মুহাম্মদ

মানুষগুলা কই যায়?

এই নদীগুলায় কচুরিপানা জন্মায় না, অথচ পানির থেইকাই প্রাণের সৃষ্টি। নদীগুলায় মাছ নাই, অথচ অনেকে কয়, মাঝিরা নৌকা বাইতে বাইতে ক্লান্ত হইলে দুই হাতে ভইরা পানি নিয়া তৃষ্ণা মিটাইতো এক সময়। এত জঞ্জালের ভেতর মানুষও একটা একটা জঞ্জাল, যে এই জঞ্জাল গুলির স্রষ্টা। মানুষের দৌড় দ্যাহে কে! আগে নদীগুলায় পালতোলা নৌকা বৈঠার তালে তালে চলতো, মানুষ ভাবতো। ভাবনার ভারে অনেক দূর ক্লান্ত হইয়া নদী পার হইতো। ঘাটে ফিরা আর বাড়ি যাইতে মন চাইতো না আরও কিছুক্ষণ নদীর লগে প্রকৃতির লগে বাতচিত করতো। এখন মোটর নৌকা চলে মানুষের দৌড়ের গতি বাড়ানোর জন্য । নৌকায় বসা কেউ বিড়ি ধরায়ে টানে, কেউ কানে এয়ারফোন দিয়া গান শোনে, কেউ পানির তীব্র গন্ধের কারনে বারবার উহুআহা করে। শেষমেশ ঘাটে নাইমা কই যাওয়ার লাইগা জানি দৌড় লাগায়।

কোন এক সময় হয়তো এই নদীগুলাও ভরাট কইরা সাড়ি সাড়ি বাড়ি হইবো আর তার মাঝখান দিয়া যাইবো দুইলেনের বড় বড় পিচঢালা রাস্তা যাতে মানুষ আরও জোরে দৌড়ায়। কিন্তু তারা কই যায়? কই যাইতে চায়? নদী মাইরা, প্রকৃতির সাথে বোঝাপড়া না কইরা তারা যেই ভাল থাকার স্বপ্ন দেখতাছে সেইটা কি কহনো সম্ভব?

এন আর সি (NRC)এবং সি এ এ(CAA), বিভাজনের রাজনীতিতে ভারত

এন আর সি ( NRC) কি এবং কেন? ভারতে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) এবং সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট (CAA) কে কেন্দ্র করে পানি অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। ভ...